মুদ্রাস্ফীতিহীন সমৃদ্ধি: ৭০ বছর আগের এক সতর্কবার্তা ও আজকের বাংলাদেশ

বাজারে গিয়ে পকেট হালকা লাগছে? ডিমের ডজন ১৫০ টাকা শুনে মনে হচ্ছে—কিছু একটা ভীষণভাবে ভুল হচ্ছে?
আপনি একা নন।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, ঠিক এই পরিস্থিতির কথাই প্রায় ৭০ বছর আগে লিখে গেছেন একজন মার্কিন অর্থনীতিবিদ—Arthur F. Burns। ১৯৫৭ সালে তার লেখা বই Prosperity Without Inflation পড়লে আজকের ২০২৫ সালের বাংলাদেশের অর্থনীতির সঙ্গে মিল খুঁজে পাওয়া যায় একদম হুবহু।
ভারী অর্থনীতির ভাষা বাদ দিয়ে, চলুন সহজভাবে দেখি—এই বই থেকে আমরা আজ কী শিখতে পারি।
১. ‘মন্থর মুদ্রাস্ফীতি’—নীরব ঘাতক (The Silent Killer)
আমরা অনেকেই ভাবি,
“দাম একটু-আধটু বাড়লে সমস্যা কী?”
একসময় অর্থনীতিবিদরাও বলতেন—বছরে ১–২% দাম বাড়া নাকি ভালো। কিন্তু বার্নস সাবধান করেছিলেন এই Creeping Inflation বা মন্থর মুদ্রাস্ফীতি নিয়েই।
তার কথায়, এটা উইপোকার মতো—শুরুতে বোঝা যায় না, কিন্তু ৫–১০ বছর পর দেখবেন আপনার সঞ্চয়ের টাকায় আর আগের মতো কিছু কেনা যায় না।
বাংলাদেশে গত এক দশকে আমরা ঠিক সেটাই দেখেছি। GDP বেড়েছে, বড় বড় প্রকল্প হয়েছে—কিন্তু বাজারে গেলে মনে হয় টাকার মান দিন দিন গলে যাচ্ছে।
বার্নসের সতর্কবার্তা পরিষ্কার:
সহনীয় মনে হওয়া মুদ্রাস্ফীতিই একসময় সবচেয়ে ভয়ংকর হয়ে ওঠে।
২. ‘ইনফ্লেশনারি সাইকোলজি’—ভয়ের বাজার
খবর শুনলেন—
“কাল থেকে তেলের দাম বাড়বে”
আপনি কী করেন? আজই গিয়ে বেশি করে কিনে ফেলেন।
বার্নস একে বলেছেন Inflationary Psychology— যখন মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করে যে দাম আর কমবে না, তখন ভয় থেকেই বাজার আরও অস্থির হয়ে পড়ে।
এই ভয়ের ফলেই:
মানুষ অতিরিক্ত কেনাকাটা করে
কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়
দাম আরও বেড়ে যায়
বাংলাদেশে ডলার বাজার, সয়াবিন তেল কিংবা পেঁয়াজ—সব ক্ষেত্রেই আমরা এই মনস্তত্ত্ব দেখেছি।
বার্নস বলেছিলেন, এই ভয় কাটাতে হলে শুধু কথায় নয়— কেন্দ্রীয় ব্যাংককে কঠোর সিদ্ধান্ত নিতেই হবে।
৩. প্রবৃদ্ধির নেশা বনাম টাকার মান
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আমেরিকায় সরকার শপথ করেছিল— যেভাবেই হোক প্রবৃদ্ধি আর কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতেই হবে।
বার্নস এই মানসিকতার তীব্র সমালোচনা করেছিলেন। তার যুক্তি ছিল সহজ:
সরকার যখন শুধু Growth-এর পেছনে ছোটে, তখন মুদ্রাস্ফীতিকে অবহেলা করে।
বাংলাদেশের চিত্রও খুব আলাদা নয়। ৭–৮% প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরে:
দেদারসে ঋণ
টাকা ছাপানো
ব্যাংকিং সিস্টেমে চাপ
ফলাফল? টাকা আছে, কিন্তু সেই টাকার জোর নেই।
বার্নসের শিক্ষা স্পষ্ট— টাকার মান ঠিক না থাকলে উন্নয়ন টেকসই হয় না।
৪. পার্টি জমলে ‘মদের বাটি’ সরাতে হয়
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাজ কী?
বার্নসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি বিখ্যাত ধারণা আছে:
“পার্টি যখন সবচেয়ে জমে ওঠে, ঠিক তখনই মদের বাটি সরিয়ে নেওয়াই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাজ।”
মানে কী?
অর্থনীতি যখন খুব গরম হয়ে ওঠে—
অতিরিক্ত ঋণ
অতিরিক্ত খরচ
অতিরিক্ত আমদানি
তখন সুদের হার বাড়িয়ে টাকার প্রবাহ কমাতে হয়। এতে ব্যবসায়ীরা অসন্তুষ্ট হবে, রাজনীতিবিদরা চাপ দেবে— তবু এই তেতো ওষুধ গিলতেই হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্তমান সুদহার বৃদ্ধির নীতি (Contractionary Policy) এই দর্শনের সঙ্গেই মিলে যায়।
৫. বাংলাদেশের জন্য বাস্তব শিক্ষা (Takeaways)
বার্নসের বই থেকে আজকের বাংলাদেশের জন্য তিনটি পরিষ্কার শিক্ষা পাওয়া যায়:
▸ সিন্ডিকেট নয়, উৎপাদন
শুধু সিন্ডিকেটকে দোষ দিলে হবে না। উৎপাদন খরচ কমানো, সাপ্লাই চেইন ঠিক করাই আসল সমাধান। এটাই Cost-Push Inflation মোকাবেলার পথ।
▸ সরকারের লাগাম টানা
সরকার যদি নিজেই ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত ঋণ নেয়, তাহলে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এখানে দরকার Fiscal Discipline—আর্থিক শৃঙ্খলা।
▸ বিশ্বাস ফিরিয়ে আনা
সবচেয়ে জরুরি বিষয়— মানুষের মনে বিশ্বাস ফিরিয়ে আনা যে দাম আর লাগামছাড়া বাড়বে না।
ডলার বাজার, ব্যাংক খাত আর নীতির ধারাবাহিকতা— এই তিন জায়গায় স্থিতিশীলতা এলেই ভয় কমবে।
শেষ কথা
“মুদ্রাস্ফীতিহীন সমৃদ্ধি” কোনো রূপকথা নয়। এটা সম্ভব—কিন্তু সহজ নয়।
৭০ বছর আগে আর্থার বার্নস যে সতর্কবার্তা দিয়ে গিয়েছিলেন, ২০২৫ সালের বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে সেটাই আমাদের বাস্তবতা।
আমরা যদি শুধু প্রবৃদ্ধির সংখ্যা না দেখে টাকার মান, বাজারের বিশ্বাস আর নীতির শৃঙ্খলাকে গুরুত্ব দিই— তবেই ডিম, তেল আর চালের দামে সত্যিকারের স্বস্তি ফিরবে।
নইলে উন্নয়ন হবে, কিন্তু পকেট থাকবে ফাঁকা।